চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী। পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ফলাফলে ধস নামায় এবার শিক্ষার্থীদের দুই ধরনের কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে।
আর যারা ফেল করেছেন, তাদেরও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। চলতি বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী। ফেল করা শিক্ষার্থীরা আগামী এক মাসের মধ্যে নতুন করে পরীক্ষা দিতে পারবেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন, তারা হয়তো সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন পথ খুঁজে পাবেন। কিন্তু যারা অকৃতকার্য হয়েছেন, তাদের গল্পও এখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। বরং তাদের অনেকের ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রা শুরু হতে পারে এই জায়গা থেকেই।
বাস্তবতা হচ্ছে, জীবনের প্রথম বড় জাতীয় পরীক্ষায় ব্যর্থতা একজন তরুণ-তরুণীর মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ, বন্ধুদের সঙ্গে ফলাফলের তুলনা, লোকলজ্জা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। কেউ নিজের ওপর আস্থা হারায়, কেউ ভাবতে শুরু করে, তার সামনে বুঝি আর কোনো পথ খোলা নেই।
কিন্তু একটি পরীক্ষার ফলাফল কি সত্যিই একজন মানুষের মেধা, যোগ্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে? ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীর বহু সফল মানুষের জীবনেই এসেছে বড় ধরনের ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান কিংবা শিক্ষাজীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা। তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া আর জীবনে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া এক কথা নয়।
এবার দেখা যাক, এমন কয়েকজন মানুষের গল্প, যাদের জীবনের বড় বাধা কিংবা ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত তাদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি।
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ও নোবেলজয়ী আলবার্ট আইনস্টাইনের কথাই ধরা যাক। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি সুইজারল্যান্ডের জুরিখের ফেডারেল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। গণিত ও বিজ্ঞানে ভালো করলেও ভাষা ও ইতিহাসের মতো বিষয়ে তার ফল আশানুরূপ ছিল না। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। পরবর্তী সময়ে আরাউয়ের একটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে আবারও ভর্তির সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে তার আপেক্ষিকতাবাদ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ধারণাকেই বদলে দেয়। ১৯২১ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
আইনস্টাইনের এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো একটি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর সব যোগ্যতা প্রকাশ পায় না। একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রস্তুতি, কিছু বিষয়ের দুর্বলতা কিংবা পরীক্ষার পরিস্থিতি তার সামগ্রিক মেধার যথার্থ প্রতিফলন নাও হতে পারে।
আরেকজন বিশ্বখ্যাত উদ্ভাবক থমাস আলভা এডিসনের শিক্ষাজীবনও প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে একেবারেই মসৃণ ছিল না। শৈশবে অল্প সময় বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে সরে আসেন। তার মা বাড়িতেই তাকে পড়াশোনায় সহায়তা করেন। পরবর্তী সময়ে নিজের কৌতূহল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী উদ্ভাবক। বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবহারিক উন্নয়ন, ফোনোগ্রাফ এবং চলচ্চিত্র প্রযুক্তির বিকাশে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে।
অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের জীবনও তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার। যুক্তরাষ্ট্রের রিড কলেজে ভর্তি হলেও আর্থিক সংকটের কারণে তিনি ছয় মাসের মাথায় নিয়মিত পড়াশোনা ছেড়ে দেন। এরপরও নিজের আগ্রহের বিষয়গুলোতে ক্লাস করার সুযোগ নিয়েছিলেন। তার উদ্ভাবনী চিন্তা ও নেতৃত্ব ব্যক্তিগত কম্পিউটার, সংগীত শোনা এবং মুঠোফোন ব্যবহারের জগতে বড় পরিবর্তন এনেছে।
মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও ডিগ্রি শেষ করেননি। তিনি পড়াশোনা ছেড়ে নিজের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাজে মনোযোগ দেন। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা ও দাতা হিসেবে পরিচিতি পান।